ফারহানা মুনা। বাংলাদেশের মেয়েদের যেখানে রা কাটে না, সেখানে তিনি বাংলাদেশের নামকরা ইউটিউবারদের একজন।  খুব অল্প সময়ে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় আর কমেডিরচ্ছলে দৈনন্দিন জীবনের গল্প দেখানোর ফলে ফারহানা মুনাটিক এখন সবার মুখে মুখে। কিন্তু এই পথটা ঠিক অতটা সহজ না। বিবাহিত মেয়ে ক্যামেরার সামনে সাবলীল অভিনয় করছে, কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে, এটা ঠিক এখনও এই সমাজ মেনে নিতে প্রস্তুত না। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় সাপোর্ট হচ্ছেন তার শাশুড়ি। যিনি কিনা পাঞ্জাব লুধিয়ানার ফুড ও নিউট্রিশিয়ান ডিপার্টমেন্টের হেড। শুধু ইউটিউব না, মুনা আপুর সঙ্গে  ফেমিনিজমবাংলার আড্ডায় উঠে এলো নারী আর নারীর ক্ষমতায়নের অনেক গল্প।

ইউটিউবার হওয়ার আগ্রহ কি হুট করেই এলো?

আমার কোন চিন্তাই ছিল না ইউটিউবার হবার। আমি ছিলাম ফুল টাইম টিচার। মিডিয়া, এন্টারটেইনমেন্ট, নাচ,গান কিচ্ছু করতাম না। তো ঈদের দাওয়াতে গিয়েছিলাম। ওটা ছিল যাকে বলে খাস বাঙ্গালী সার্কেল। এক বছর পর ওরকম একটা সার্কেলে গিয়েছিলাম। ২০ কিলোর মত ওজন তখন কমিয়েছিলাম। সব মহিলারা প্রায় ঝাঁপায় পড়ছে। ওই জিনিসটাই অ্যাক্টিং করে স্বামীকে দেখিয়েছিলাম। স্বামী হাসতে হাসতে শেষ। তো সেটাই কি ভেবে অ্যাক্টিং করি, ভিডিও করি। ফেসবুকে আর ইউটিউবে দিয়ে ঘুমাতে চলে গেলাম।ঘুম থেকে উঠে দেখি ২১টি ভিউ। কতবড় ব্যাপার ২১ জন আমার ভিডিও দেখেছে। পরের দিন ভিডিওটা মজা লস শেয়ার দেয়। সঙ্গে আরও অন্যান্য সাইট। ৬০ থেকে ৭০ হাজার ভিউয়ারস হয়ে যায়। মেসেজ আসতে থাকে আরও চাই আরও চাই। আমনও মেসেজ আসল “আমার খুব খারাপ দিন যাচ্ছে, আপনার ভিডিও দেখে অনেকদিন পর হাসলাম”। তো আমি ভীষণ ইন্সপায়ারড হলাম। এরপর থেকেই শুরু।আরেকটা বানালাম, আরেকটা বানালাম। এভাবেই চলছে।

ভিডিওর সাবজেক্ট কীভাবে বাছাই করেন?

ঢাকা থেকে আট বছর বাইরে আছি। খুবই কম যাওয়া হয়। তাই ঢাকায় কি হট টপিক চলে আমি জানি না। অনেক হট টপিক, অনেক ট্রেন্ড চলে যায়, আমি দেখতেও পাই না। তাই আমি কমেডি টাইপ করে মূলত হিপোক্রেসিগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করি।

muna 2

নিজেকে কতটুকু আর্টিস্ট ভাবেন?

আমি প্রফেশনাল অ্যাক্টর না, আবার আর্টিফিশিয়ালও না। আম্মু বাসায় যেমনে নাক ডাকে, দেখি,সেভাবেই নাক ডেকে অভিনয় করি। রিয়েল লাইফের চরিত্রগুলোই অনুকরণ করে অভিনয় করি।

কোন মেসেজ দেবার জন্যই কাজ করা হয়?

আমার মনে হয় অন্যান্য যারা ভিডিও বানান, তারাও কমেডির ছলে মেসেজই দিতে চায়। আমি একজন মেয়ে হিসেবে জানি মেয়েদের ঠিক কি কি ফেস করতে হয়, চাকরিতে কিংবা একজন জিএফ হিসেবে, বোন হিসেবে। এই সবগুলোই আমি যদি তুলে ধরতে পারি, তাহলেই আমি সার্থক।

মেয়েদের কতটা ইন্সপায়ার করতে পারছেন?

শয়ে শয়ে মেয়েরা আমাকে মেসেজ করে। তাদের মধ্যে রয়েছে হাউজওয়াইফ, কর্পোরেট, টিনএইজ। মেসেজ দেয় তারা “সাহস পাচ্ছে আমাকে দেখে তারা। পাবলিকলি একজন মেয়ে নিজেকে এক্সপোজ করছে, ম্যারিড হয়েও কোন তোয়াক্কা করছে না, এইসব তাদেরকে অনুপ্রাণিত করে”। আমাকে দেখে যদি ৫ টি মেয়েও ইউটিউবে আসে আমি সফল। বাউন্ডারি তো কাউকে না কাউকে ভাঙতেই হবে। সেটা আমি ভেঙ্গেছি।

বাজে মেসেজ, কমেন্ট আসে না? তখন মানসিক অনুভূতি কি হয়?

প্রথমে তো খুবই খারাপ লাগত। এখনও লাগে। আমিও তো মানুষ। সবসময় বোদার করিও না। কিছু নেগেটিভ কথা নিয়ে ভাবিও। আমার ভিডিও দেখে দশটা মানুষেই হাসবে না। তারা আমাকে তীক্ষ্ণ মন্তব্য করতে পারে। কিন্তু কিছু লোক আজাইরা গালিগালাজ করে, ফ্যামিলিকে বাজে কথা বলে, ন্যুড ছবি দেয়। খুব খারাপ লাগে। তাই সকালবেলা এখন আমার প্রথম কাজ হচ্ছে পেইজকে ক্লিন করা। “রেপ কমেন্ট”গুলোকে ডিলিট করা। স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে রোজ আমি কিছু পজিটিভ মেসেজ পড়া দিয়ে দিন শুরু করি। তারপর বাজে মেসেজ পড়লে মেজাজ গরম হলে, বন্ধু বা স্বামীর সাথে যত তাড়াতাড়ি পারি শেয়ার করি। একটু পর দ্রুত ভুলে যাই। আমি পজিটিভ নেগেটিভ দুটোর সঙ্গেই ডিল করি। নিজেই মোটিভেটেড হই এইভাবে।

muna 5

দেশে কবে এসেছিলেন?

২০১৫ র মে তে এসেছিলাম। ২০১৬ তে আবার আসব। টুকটাক কিছু প্রজেক্ট, অ্যাড হাতে নেবার ইচ্ছা আছে।

প্রথম ভিডিও কবে আসে?

২০১৫ সালের ২৬ শে সেপ্টেম্বর। খুব বেশীদিন আগের না।

দেশের বাইরে বহুদিন আছেন! নারীরা ওখানে কতটুকু বৈষম্যের শিকার হচ্ছে?

ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডে জেন্ডার ডিস্ক্রিমিনেশন ভয়াবহ। চাকরির টপ র‍্যাঙ্কে বেশির ভাগ মেয়েই নেই। কোম্পানির সিইও হয়ত ১% র মত মেয়ে থাকতে পারে। এই বৈষম্য চলে কথায় চলে, কাজে চলে। কোম্পানি তে মেয়েরা মুখে মুখে কত হ্যারাজ হয়, কিন্তু ভয়ে প্রতিবাদ করে না, জব থেকে বের করে দিবে বলে। শুধু অ্যাকাউনটিবিলিটি এই যে, সরকারের কাছে আমি আবেদন করতে পারি।

আপনার চাকরির অভিজ্ঞতা বলেন!

আমি তো টিচিং এর আগে অস্ট্রেলিয়ার ল ফার্মে ট্রেইনিং কো-অরডিনেটর ছিলাম। ওখানে আমি ইকুয়াল অপরচুনিটি পাই নি। কোন ছেলে যদি পারফরম্যান্স ভাল করার চেষ্টা করত তাকে বলা হত কি ambitious ছেলেটা, আর আমি করলেই আমাকে বলা হত “Oh! You are being aggressive”! আমার এক মেল ম্যানেজার একবার আমাকে সেকজুয়াল হ্যারাজ করার চেষ্টা করে। আমি প্রতিবাদ করতে গেলে আমাকে চাকরি থেকে ফায়ার করে দেওয়া হয়। আমি অস্ট্রেলিয়া গভঃ এর কাছে আবেদন করি। আমাকে চাকরি ফেরত দেওয়া হয়, আমি অবশ্য চাকরিতে ফিরে আর যাই নি। ওই লোকের বিরুদ্ধে আমি ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশনে যাই, সে ক্ষমা চায়। কোর্ট অ্যাকশনে যাই নি। জাস্ট পার্থক্য এই যে এখানে আমি সহজে লিগ্যাল অ্যাকশনে যেতে পারি, কিন্তু ডিস্ক্রিমিনেশন কম না!

muna 6

ছোটবেলার কথা একটু জানতে চাই!

আমি বিজনেস লাইনে পড়াশুনা করেছি। জন্ম মিডলইস্টে। ক্লাস সিক্স টু টুয়েলভ মানারাতে পড়লাম। এরপর বিদেশে আসার প্ল্যান করি। আমাকে মানারতে পড়ার সময় জোর করে বোরখা পরান হত। তো আমি বাইরে যাবার কথা বললে আমার ফ্যামিলি কিছুতেই মেনে নিল না। বলল বিয়ে ছাড়া বাইরে দিতে দিবে না। আমি তখন কিছুতেই ওই পরিবারে থাকব না। তো কি আর করা! হাঙ্গার স্ট্রাইক শুরু করলাম। বিদেশে পাঠান হল আমাকে বড় ভাইয়ের কাছে। সেই থেকে আট বছর।

নারী মুক্তি আপনার কাছে কি?

অস্ট্রেলিয়া তে আমি যেটা ইচ্ছা সেটা করতে পারছি। কেউ কিছু মনে করছে না। টু বি অনেস্ট এই নারী মুক্তি টার্মটা কিন্তু কোন এক্সটার্নাল জিনিস না। নারিদের ভিতর থেকেই মুক্তি চাইতে হবে। নিজ হাতে নিজেকে মুক্ত করতে হবে। To be free, own it and take responsibility- ফিমেল empowerment র জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস বলে মনে করি।

নিজ জীবন থেকে এই নারী মুক্তি কীভাবে দেখেছেন?

আসলে কেউ তোমার জীবন চেঞ্জ করতে আসবে না, তোমাকে মুক্তি দিতেও না। আমার মা ই তো বলে বিয়ের পর সংসার ফালাইয়া কি ক্যামেরার সামনে ফালাফালি করস!  কিন্তু আমি নিজেকে ফ্রি করি, যাচাই করি আমি কে? আমি কি হ্যাপি থাকব এটা ছাড়া? উত্তর পেয়েছি না। দেন আমি এটাই বেছে নিয়েছি।  ফ্যামিলিকে মানিয়ে করা গেলে খুবই ভাল। কিন্তু প্যাশন কে দম করে কাজ করলে সেটা বেশীদূর আগান যায় না।

muna 7

তাহলে কি ফ্যামিলি সাপোর্ট একদমই আসে না?

আমার বড় সাপোর্ট কে বলত? আমার শাশুড়ি। আনিতা তাঁর নাম। তিনি পাঞ্জাবের লুধিয়ানার ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশিয়ান হেড অফ দি ডিপার্টমেন্ট। পিএইচডি হোল্ডারও। তিনি আমার কাজে ভীষণ সাপোর্ট দেন। তিনি আমাকে বলেন প্রত্যেক মেয়ের নিজস্ব আইডেন্টি থাকা উচিত। তিনিই আমাকে বলেছেন “ ছেলেকে নিয়ে যতটুকু গর্ব করি, তোমাকে নিয়ে তার চাইতেও যেন বেশী গর্ব করতে পারি” । শী ইজ মাই বিগেস্ট রোল মডেল। তাঁকে দেখেই বুঝেছি ফিমেল এমপাওয়ার মানে ঘর বাড়ি সংসার ছেড়ে দেওয়া নয়। সব কিছু করেই নিজের কাজকে মেইনটেইন করাই ফিমেল এমপাওয়ারমেন্ট।

 

 

বাংলাদেশের মেয়েদের নিয়ে কতটুকু আশাবাদী!

ওয়েস্টার্ন দেশে মেয়েদের মধ্যে ভীষণ পলিটিক্স, জেলাসি। কম্পিটিশন গ্রহণযোগ্য, কিন্ত জেলাসি না। সেটাই এই দেশগুলোতে হয়। একে অপরকে নিচে নামাতে চায়। সেই দিক থেকে বাংলাদেশের মেয়েদের মধ্যে প্রচণ্ড সিস্টারহুড বজায় থাকে। মেয়েরা মেয়েদের সাপোর্ট করে প্রচুর। এভাবেই বাংলাদেশের মেয়েরা এগিয়ে যাবে, ফ্যামিলিও আর বাঁধা দেবে না, তাদের পাশে থাকবে।

 

 

Advertisements