মেয়ে নেটওয়ার্কের ব্যবসায়িক শাখা হুটহাট গ্রুপ। এই গ্রুপের একজন অন্যতম উদ্যোক্তা তিনি। তারও বাইরে একজন নারী উদ্যোক্তা। বলছি সাবরিনা আপুর কথা। সংসারকে সামলে, নিজের শখকে প্রায়োরিটি দিয়ে গড়ে তুলেছে অনলাইন শপ তন্তু। দেশীয় কাপড় নিয়ে কাজ করার মধ্যে একটা আলাদা তৃপ্তি আছে। সেই তৃপ্তির গল্প আর হুটহাট গ্রুপের গল্প শুনতেই সাবরিনা আপুর মুখোমুখি ফেমিনিজমবাংলা।

তন্তু মানে সুতা, আপনার অনলাইন বিজনেস কি সুতা নিয়েই ?

জি, তন্তু মানে সুতো। তবে আমার অনলাইন ব্যবসা শুধু সুতো নিয়েই নয়, বরং দেশীয় কাপড় এবং পোশাক নিয়ে। আরও ভেঙ্গে বলতে গেলে শুরুটা মুলত জামদানী নিয়ে, তবে সামনে যশোর স্টিচ, রাজশাহীর সিল্ক নিয়েও কাজ করার ইচ্ছা আছে সামনে। মজার বিষয় হল ব্যবসার জন্য প্রথম যেটুকু সঞ্চয় ইনভেস্ট করেছিলাম তা ছিল সুতোর উপরে। সেখান থেকেই তন্তুজ (তন্তু থেকে শুরু, তাই তন্তুজ) নামটা মনে ধরেছিল। পরবর্তীতে কিছুটা পরিবর্তন করে আমাদের ব্র্যান্ডের নাম হিসেবে ‘তন্তু’ final করা হয়।

উদ্যোক্তার শুরুর গল্প জানতে চাই !

শুরুটা কিন্তু একদিনে হয়নি। উদ্যোক্তা হব এমন ভাবনাচিন্তা প্রকটভাবে না থাকলেও মনের গহীনে ‘নিজের কিছু হলে ভাল হত’ এরকম একটা ধারনা কিন্তু উঁকি দিত মাঝেমাঝেই। নিজের পোশাক নিজেই ডিজাইন করে পরেছি সবসময়। এক সময় চাকরি করতে শুরু করি। সে সময়েই মূলত নিজের কিছু করতে হবে এবং সেটা আমার পছন্দের ‘জামদানী’ নিয়েই করতে হবে এমন ধারনা মনে চেপে বসে। সেই থেকে ধীরে ধীরে তন্তুকে মনে মনে আকার দিতে থাকি। কিভাবে কি করতে চাই তা ঠিক হয়ে গেলে জামদানীর উপরে রিসার্চ করা শুরু করি। তন্তুর অফিশিয়াল লঞ্চের আগে প্রায় ৬ মাস শুধু দেশীয় কাপড় এবং সুতো নিয়েই পড়াশোনা, রিসার্চ করেছি। বিশেষ করে জামদানী সুতো এবং জামদানী শাড়ির পেছনেই প্রায় মাস তিনেক ব্যয় করেছি। এরপরে তাতিপাড়ায় যাতায়াত করে এবং শাড়ির সুতো, বুনন ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা নিয়ে এবং নিজের প্ল্যান অনুযায়ী কাজ গুছিয়ে নিয়ে শুরু করি তন্তুর আনুষ্ঠানিক যাত্রা।

tontu 2

বাঁধা-বিপত্তি কেরকম দেখেছেন একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে ?

তন্তুর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়ে বেশি দিন হয়নি। একবার তন্তু শুরু হবার পরে এখন পর্যন্ত তেমন কোন বাঁধার সম্মুখীন হইনি আসলে। তবে রিসার্চ করার সময় এবং ইনিশিয়াল স্টেজে নারী হবার কারণে অনেকক্ষেত্রেই বাঁধার সম্মুখীন হয়েছি। শাড়ি চেনার জন্য, সুতোর জন্য তাতিপাড়ায় ঘুরতে হয়েছে, কথা বলতে হয়েছে। তখন অনেকেই এগুলো করতে মানা করেছেন। সব চাইতে বেশি শুনতে হয়েছে যে কথা সেটা হল, শখের পিছে এত শ্রম কেন দেয়া। তন্তু যে আমার শুধু শখ নয় বরং এটা আমার কর্মক্ষেত্র, আমার এগিয়ে চলার প্রেরণা; সেই বিষয় বোঝাতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে আমাকে। তাছাড়া, আমার কাজের গুরুত্মও দিতে চায়নি অনেকে প্রথমদিকে। আবার অনেককে এটাও বলতে শুনেছি যে কি এমন প্রয়োজন পড়ল এসব কাজ করার। আমি যে প্রয়োজনে কাজ করছিনা, নিজের ক্যারিয়ার, নিজের উদ্যোগ দাঁড়া করানোর চেষ্টা করছি সেটা তন্তুর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবার পরে এবং সবার কাছে থেকে সাড়া পাবার পরে বোঝাতে পেরেছি তাদের। এছাড়া নারী হবার কারণে পণ্যের গুণগত মান এবং মূল্য সম্পর্কিত ধারণা কম থাকবে আমার এমন ধারণা পোষণ করতে দেখেছি অনেককে। অনেকেই চেষ্টা করেছেন ঠকাতে, তবে আমি ঝোঁকের বশে ব্যবসা করতে আসিনি এটা বুঝতে পেরে সরে গেছেন তারা।

 

কেন তন্তু ? অন্য কিছু নিয়ে অনলাইন বিজনেস না কেন ?

“তন্তু” কারণ ঐযে বললাম না ঝোঁকের বশে বা ট্রেন্ড দেখে ব্যবসা করতে আসিনি আমি। তন্তু আমার কাছে প্রেরণার আরেক নাম। এখানে আমরা যেসব শাড়ি এনেছি সেগুলো আমার এবং কারিগরের নিজস্ব ডিজাইনে তৈরি। এখানে বলে রাখি আমরা বলতে আমি এবং শাহারিয়ার ইসলাম। উনি তন্তুর ফাইন্যান্সিয়াল পার্টনার এবং আমার জীবনসঙ্গী এবং পেশায় একজন পুরদস্তুর ব্যাংকার। এখন অন্য আর সকল অনলাইন ব্যবসার মত একটা পেইজ খুলে ব্যবসা করতে নামলে নিজের আইডিয়া এবং ডিজাইন প্রকাশ করতে পারতাম না আমি যে সুযোগ তন্তুর কারণে পেয়েছি আমি। এছাড়া দেশীয় কাপড়ের যে বিশাল সমারহ আমাদের দেশে আছে সেগুলোর প্রতি গ্রাহকদের আকৃষ্ট করাও অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আমাদের।

তন্তু অন্যান্য অনলাইন ক্লথিং সেন্টারের চাইতে কেন আলাদা ?

তন্তু আসলে সেভাবে বলতে গেলে শুধুমাত্র কোন ক্লোথিং সেন্টার নয়। আমি তন্তুকে একটা ব্র্যান্ড হিসেবে কল্পনা করি এবং সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছি। আমি নিজস্ব ডিজাইনের পোশাক তৈরি করে এবং শাড়ি বানিয়ে গ্রাহকদের হাতে তুলে দেবার চেষ্টা করি। সে হিসেবে আমাদের অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা বলা যায়। এছাড়া তন্তু শুধুমাত্র দেশীয় পোশাক, কাপড় এবং সুতো নিয়েই কাজ করছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধারা বজায় রাখতে চায়। এভাবে চিন্তা করলেও তন্তুকে অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা ভাবা যেতে পারে, নয় কি? তবে সত্যি বলতে দেশি পোশাক, কাপড় নিয়ে কাজ করেন যারা তাদের সহযাত্রী হতে পেরে তন্তু এবং আমরা খুবি আনন্দিত এবং গর্বিত।

tontu 3

পুঁজি কেমন ছিল?

তন্তুর জন্য প্রথম যেটুকু পুঁজি আমরা ইনভেস্ট করেছিলাম তা ছিল মাত্র ষোলো হাজার টাকা। এটুকু দিয়েই তন্তুর যাত্রা শুরু করি।

নিজের কারিগর আছে, নিজের ডিজাইনে কাপড় বানান নাকি কাপড় কিনে আনেন ঘুরে ঘুরে ?

আমাদের নিজস্ব কারিগর আছে। তন্তুর জামদানী শাড়ি তৈরির তাতি আছে যার সাথে মিলে আমরা ডিজাইন করে শাড়ি তৈরি করি। আমাদের সব জামদানী শাড়ি আমাদের কারিগরের নিজের তাতে বোনা, বাজার ঘুরে কিনে আনা নয়। এছাড়া অন্যান্য দেশীয় কাপড় যা কিনতে হয়, তা এখনো ঘুরে ঘুরে কিনে আনি আমরা।

ফিডব্যাক খারাপ আসলে মন খারাপ হয় ?

সত্যি বলতে এখন পর্যন্ত সেরকম খারাপ কোন ফিডব্যাক পাইনি। আমার গ্রাহকরা বেশ ভাল এবং সাপোর্টিভ। হ্যা, এমন হয়েছে এক দুইজন শাড়ির ডিজাইন পছন্দ হয়নি এমন মন্তব্য করেছেন। সেগুলো নিয়ে আসলে মন খারাপ হয়নি। বরং তাদের কথাগুলো মাথায় রেখেছি নতুন কালেকশন তৈরি করার সময়ে। আশা করছি, এরপরে তাদের যেটুকু অভিযোগ ছিল সেটা দূর হয়েছে কালেকশন দেখে।

baby

পরিবার, সংসার , বিজনেস কীভাবে ম্যানেজ করেন, সহযোগিতা পান ?

পরিবার থেকে অনেক সাপোর্ট পাই। আমার বাবা- বোন এবং শ্বশুরবাড়ি দুই পরিবারই খুব সাপর্ট করেছে আমার উদ্যোগটিকে। তাদের সহযোগিতা না পেলে এত কষ্ট করে তন্তু শুরু করতে পারতাম না হয়ত। সংসারের কথা বলতে গেলে বলব, সংসার আসলে দুই চাকার গাড়ির মত। দুইজন effort না দিলে সুন্দরভাবে সংসার চালানো বেশ কষ্ট। এই দিকে আমি বেশ ভাল অবস্থানে আছি বলা যায়। সংসার সামলানোর জন্য আমার করনীয়টুকু করলেই যথেষ্ট ছিল সব সময়। বাকিটা শাহারিয়ার করেছেন। আবার অনেক সময় এমন হয়েছে তন্তুর কাজে আমরা দুইজনেই ব্যস্ত তখন পরিবারের অন্য সদস্যরা মিলে সংসারের সব দায়িত্ব সামলে নিয়েছেন। যেমন- হয়ত তন্তুর কাজে আমাদের ঢাকার বাইরে থাকতে হবে সারাদিন, তখন পরিবারের সব সদস্যরা পালা করে আমার বাচ্চাদের দেখে রেখেছেন, যত্নআত্তি করেছেন। আমাকে সেসব নিয়ে চিন্তাও করতে হয়নি। তন্তুর পিছে যদি আমাদের শ্রম থাকে তবে পরিবারের সহযোগিতাও আছে ষোলো আনা। এ জন্য আমি তাদের প্রতি সব সময় কৃতজ্ঞ থাকব।

tontu 4

হুটহাট অ্যাডমিন হিসেবে নারী উদ্যোক্তার এই হাটে থেকে নিজের কোন বোধদয় বা অনুভূতি ?

“হুটহাট” হল “মেয়ে নেটওয়ার্কের” অন্তর্গত পণ্য কেনাবেচার জন্য গড়ে ওঠা চমৎকার একটি ফেসবুক গ্রুপ। হুটহাট মেয়ে নেটওয়ার্কের গ্রুপ হলেও শুধুমাত্র মেয়েদের গ্রুপ কিন্তু নয়। সকল ধরনের দেশীয় পণ্যের উদ্যোক্তা, বিক্রেতা এবং গ্রাহকদের গ্রুপ হুটহাট। হুটহাটে আরো একজন অ্যাডমিন আছেন, তিনি হলেন তৃষিয়া নাশতারান। উনাকে ছাড়া হুটহাট অসম্পুর্ন। নারী উদ্যোক্তা এবং দেশীয় পণ্যের উদ্যোক্তাদের জন্য হুটহাট আজ যে নির্ভরযোগ্য নাম হয়ে উঠেছে তার পেছনে তৃষিয়া নাশতারানের অবদান অনেক। আমি হুটহাটের অ্যাডমিন হিসেবে শুধু নয়; একজন সদস্য, গ্রাহক এবং একজন বিক্রেতা হিসেবে বলতে চাই হুটহাট দেশীয় পণ্যের প্রতি আমার ভালবাসা বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকগুণে। হুটহাটে যারা আছেন তাদের প্রায় সবার নিজস্ব ডিজাইন ও পণ্য দেখে আমি অভিভূত। এক একজন উদ্যোক্তার innovation power আমাকে আমার কাজের প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলে। এছাড়া শুধুমাত্র competition নয়, বরং পারস্পারিক সহযোগিতার মাধ্যমে আরও ভালভাবে কাজ করা সম্ভব এটা আমি হুটহাটে এসেই দেখেছি। তন্তুর পেছনে হুটহাটের নারী উদ্যোক্তা রোকসানা রশীদ, রুমানা শারমিনদের অবদান কম নয়। এছাড়া ফোয়ারা ফেরদৌস, শাওন রেজাদের কাছে থেকে ভাল কাজ করার অনুপ্রেরণা পাই আমি সব সময়।

ফেসবুক লিংকঃ https://www.facebook.com/tantufied/?fref=ts

 

Advertisements