এক চার দেওয়ালে বন্ধ থাকা গৃহবধূর গল্প হতে পারত এটা। যে দারুণ রান্না করে তাক লাগিয়ে দেয় সবাইকে। কিন্তু ইচ্ছা এর পরিশ্রম গল্পটাকে বদলে দিল। মেহেনুর সুমি আপু হয়ে উঠলেন নারী উদ্যোক্তা, চট্রগ্রামের এক প্রিয় নাম। বাংলাদেশে হারিয়ে যাওয়া পিঠাপুলি, বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী রান্না তুলে আনলেন তাঁর “ঐতিহ্যের স্বাদ” এর মাধ্যমে। দেশসেরা আগোরার চট্রগ্রাম শাখায় পাওয়া যাচ্ছে ঐতিহ্যের স্বাদ এর খাবার। একটা সময়ে চা বানাতে না পারা মেয়েটি, দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে হারিয়ে যাওয়ার খাবারগুলো রাঁধতে শিখে আজ দেশের ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার জন্য নীরবে কীভাবে সংগ্রাম করে যাচ্ছে সেই গল্পই উঠে এলো সুমি আপুর সঙ্গে ফেমিনিজমবাংলার আড্ডায়।

উদ্যোক্তা হবার শুরুর গল্পটা
উদ্যোক্তা হতে চেষ্টা করছি। কতটা হতে পেরেছি জানি না। বিয়ে হয়েছে খুব কম বয়সে। বিয়ের পর এসএসসি দেই। রান্নার বিভিন্ন ট্রেইনিং নেই সিদ্দিকা কবিরের কাছে, চিটাগাং ক্লাবে। রান্নাকে ভালবাসি বলেই উদ্যোক্তা হয়েছি। চেয়েছি রান্নার মাধ্যমে দেশীয় ঐতিহ্য কে তুলে ধরার জন্য। বাচ্চাদের ফার্স্টফুডপ্রেমের কারণে, দেশের অনেক ঐতিহ্যবাহী খাবার হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য মানুষের সামনে তুলে ধরতে, প্রচার প্রসারের কাজে মানুষকে সুযোগ দিতে এবং নিজে স্বাবলম্বী হবার আগ্রহই মূলত “ঐতিহ্যের  স্বাদ” সৃষ্টির পিছনে কাজ করেছে।

ehjtrcxs

কাজে পরিবারের সহযোগিতা কেমন পাচ্ছেন ?
আসলে কি মেয়েদেরকে হুট করে কাজ করতে ডিসিশন কেউ দিতে চায় না। একটা বাঁধা এসেই প্রথমে পরিবার থেকে। তবে আমার মা আমাকে ১০০% সহায়তা করেছে, ভাই ও মেয়ের কথা না বললেই না। মেয়েই আমাকে বলেছে মা তুমি লেখাপড়াটাও শুরু কর। মা ও মেয়ের অনুপ্রেরণা, নিজের শখের তাগিদে আর সবকিছুর বাঁধা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি।
কীভাবে শুরু ?
আমি মোজো পিঠা উৎসবে সেকেন্ড হয়েছিলাম। ১৪১৪ রাঁধুনি তে চিটাগাং সেরা দশে ছিলাম। কিছু কারণে আর ঢাকায় যাওয়া হয় নি। তাছাড়া এনটিভির রান্না বিষয়ক প্রোগ্রামে , স্টারশিপ আগ্রাবাদে অংশগ্রহণ করি। রিতা মুজিব, সিদ্দিকা কবিরের কাছ থেকে সার্টিফিকেটও পাই, এভাবেই আসলে শুরুটা হয়ে যায়।
এই যে অনেক ঐতিহ্যবাহী রান্না তো হারিয়ে গিয়েছে, ওগুলো আবার তুলে ধরার চেষ্টাটা কীভাবে করছেন?
বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে শিখছি। সব রান্না আমার পক্ষে জানা সম্ভব না। তাই যশোর, লাকসাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, এইসব জায়গায় ঘুরে ঘুরে বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে কথা বলি, তাঁদের কাছ থেকে রান্নাটা শিখে নেই। এভাবেই ঐতিহ্যবাহী খাবার বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি।

oittijjer

কখনও কাস্টমারদের খারাপ ফিডব্যাক মন খারাপ করায় ?
আমার রান্না প্রায় মানুষই পছন্দ করে। কিছুক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ পেয়েছি। এখন কাস্টমারের ভালমন্দ দুটাই আমাকে জানতে হবে। কারও একটা খাবার ভাল লাগবে, কারও ওটাই খারাপ লাগবে। সেগুলো আমি নোট করি। কারণ আমার তো তাদের টেস্ট বুঝতে হবে। এভাবেই নিজেকে সংশোধন করার চেষ্টা করি।
অল্প দিনেই ঐতিহ্যের স্বাদ মানুষের মন কেড়ে নিয়েছে ।
আসলে আমরা ১০০% আন্তরিক। ঐতিহ্য কে তুলে ধরতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ । আমাদের motto হচ্ছে “মমতার পরশে বিশুদ্ধতা নিশ্চয়তা”।

12243170_951291601596350_1412180439673764164_n

ঐতিহ্যের স্বাদ নিয়ে স্বপ্ন
স্বপ্ন তো অনেক। ঐতিহ্য স্বাদকে আমি আমার সন্তানের মত লালন করি। ইচ্ছা আছে পুরো বাংলাদেশ জুড়ে এর আউটলেট থাকবে একদিন । না! নতুনের আগমনকে আমি বাঁধা দিতে চাই না। কিন্তু বাচ্চাদের ফাস্টফুডের প্রেমের কাছে পুরান ঐতিহ্য , পিঠা-পুলি হারিয়ে যাক সেটাও আমি চাই না। তাই ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে আমার ঐতিহ্যের স্বাদ নিয়ে এই নীরব সংগ্রাম চলবেই।
শেষ কথা, উদ্যোক্তা হতে চান যেসব নারীরা, তাদের প্রতি কিছু কথা
দেখুন, পরিশ্রম করলে এবং সদিচ্ছা থাকলে যে যেখানেই থাকুক উঠে আসবে। এই তো ৯৪ সালে আমি চা করতে পারতাম না । বয়স কম ছিল। আজ গর্ব করে বলতে ইচ্ছে হয়, আমি রান্নায় অনেক সমৃদ্ধ হয়েছি। এখনও আমি শিখছি। সাফল্যের পূর্বশর্ত , ৯৯ ভাগ পরিশ্রম, বাকি এক ভাগ অন্যসবকিছু। এর কোন বিকল্প নেই। সততার সাথে পরিশ্রম আর বুকের মাঝে দৃঢ় সদিচ্ছা, একটা মানুষকে যেকোনো অবস্থান থেকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে পারে।

 

ঐতিহ্যের স্বাদ এর ফেসবুক লিংকঃ https://www.facebook.com/oitijjershadh.ctg/?fref=ts&pnref=story

Advertisements