সারিতা আহমেদ পেশায় শিক্ষিকা। তার বাইরে পরিচয়, লেখালিখির জগতে যুক্ত। তসলিমা নাসরিনের প্রিয় শিষ্য। খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন তসলিমা নাসরিনকে, এই নির্বাসিত জীবনে তসলিমা নাসরিনের কাছের মানুষও তিনি। বিতর্কিত, নারীবাদী লেখিকা, এই পরিচয়ের বাইরে অন্য  এক তসলিমা নাসরিন উঠে আসল সারিতার সঙ্গে ফেমিনিজম বাংলার আড্ডায়।

দিদি কখনও কি মনে হয়, যে মেয়েদের জন্য তসলিমা নাসরিন লড়াই করেছিলেন , তাঁকে যখন দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, প্রত্যেক নারী যদি হাতে হাত রেখে রাস্তা বন্ধ করে দিত, কোন অপশক্তি থাকত তসলিমা নাসরিনকে দেশ ত্যাগ করাতে পারে ? তাহলে নারীদের জন্য তাঁর যে সংগ্রাম, সেটা কি ফলপ্রসূত নয় ?
আসলে প্রত্যেক মানুষ , তা নারী হোক পুরুষ হোক কখনোই এক মানসিকতার হতে পারে না । যতই তাদের উপর অত্যাচার হোক নিপীড়িত মানুষ হোক তারা হয়তো মানসিক ভাবে পাশে থাকতে চায় নিরাপদ দুরত্বে । কিন্তু সবাই মিলে একজোট হওয়ার ইচ্ছে বা পরিস্থিতি কোনোটাই একসাথে থাকে না ।নারীরা তসলিমা দির লেখায় নিজেদের যন্ত্রনা , জেদ , কান্নাগুলো মেলাতে পারে । তাঁকে সাপোর্টও করে কিন্তু রাস্তায় নামার মত অবস্থা তাদের সবার নেই ।

toslima nasrinতবুও একটা কথা। বেশ কদিন আগে তসলিমা নাসরিন “বাংলাদেশ প্রতিদিন” এর এক কলামে লিখেছিল নারীরা নারীদের শত্রু। আমি অনেক শিক্ষিত নারীকে দেখেছি, যারা তসলিমা নাসরিনের নারী স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারে না ! তাঁর নাস্তিকবাদ, তাঁর যৌনস্বাধীনতা ! যদিও সেসব মেয়েরা নিজে নারী স্বাধীনতায় প্রচণ্ড বিশ্বাসী। কিন্তু তসলিমা নাসরিন তাদের কাছে এক ” ছি! ছি” করা নাম ? এটা আপনি হয়ত দেখেছেন, আমি তো প্রচুর দেখি। এটা কেন ? দিদি, কি মনে হয় ?
“নারীরা নারীদের শত্রু” – এটা অস্বীকার করার উপায় নেই । কারণ মেয়েদের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ছাড়া পুরুষতন্ত্র টিকতে পারত না । তাই যে মেয়েরা মেয়েদের উন্নতি র পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তারা কিন্তু অবচেতনে পুরুষের প্রতিনিধিত্ব করে । তারা নিজেদের পকেটে টাকা , আলমারিতে ভর্তি কাপড়চোপর , ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স , ফি হপ্তায় একটা সিনেমায় যাওয়া বন্ধুদের সাথে মাল্টিপ্লেক্সে ঘুরে বেড়ানো এসবকেই স্বাধীনতা ভাবে । আর এগুলোর জন্য নাস্তিক হবার বা যৌন স্বাধীনতার যোগ নেই । তাই পুরুষের খবরদারি ছাড়া স্বেচ্ছায় কিছু করাকেই এরা নারী স্বাধীনতা বলে ও এটার জন্যই দাবী করে । বেশির ভাগেরই একই দাবী । এই একই কারণে তসলিমার সব মতামতের সাথে তারা সহমত হয় না । ‘নারীবাদ ‘ যে মানববাদেরই অংশ সেটা ক’জন জানে ? আবার ধর্মমুক্ত না হলে যে নারীর পূর্ণ অধিকার স্থাপিত হতে পারে না সেটাই বা ক’জন মানে ?

একটা গল্প বলি, আমার স্কুলের লাইব্রেরিতে তসলিমা নাসরিনের কোন বই ছিল না ! অনেকদিন পর খুঁজে এক ম্যাগাজিন পেয়েছিলাম যেখানে লেখা ছিল তসলিমা নাসরিনের পাঁচ বিয়ের গপ্প! তো, তসলিমা নাসরিনকে অনেক লেখক পাঠক দাবি করেন “ওইসব” লেখার লেখক হিসেবে ! আপনার কি মনে হয় না, মিডিয়া বা গণমাধ্যম তসলিমা নাসরিনকে উপস্থাপন করেছে এভাবে ?
হা হা হা মিডিয়া ‘হলুদ’ রঙ পছন্দ করে । তসলিমা নাসরিনের পুরস্কার , খ্যাতি নিয়ে লিখলে ১০% পাবলিক পড়বে,জানবে । আর ওনার বিষয়ে বখাট্য মন্তব্য যারা করছে তাদের কথা ছাপলে, কল্পনাপ্রসূত রগরগে বিছানার গপ্প বেচলে ৯০% গোগ্রাসে গিলবে । এতে দুটো লাভ । এক পত্রিকার বিক্রি বেশি , মুনাফা বেশী । দুই দেশের সিংহভাগ মানুষের ফ্যান্টাসিতে সুড়সুড়ি জাগিয়ে তসলিমা. িরোধি পালে হাওয়া দেওয়া । কারণ তসলিমা নাসরিন এমন একজন সেলেব্রিটি যাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি রাজনীতি হয় এবং তাতে রাজনীতি জগতের মানুষের লাভ বৈ ক্ষতি হয় না । সেজন্যই এরম বিকৃতরুচির বই বা খবর ছাপানো হয় ।

toslima 1দিদি , তসলিমা নাসরিন বেশ কিছুদিন আগে এসাইলাম কর্মকাণ্ড নিয়ে বিরুদ্ধ মন্তব্যে পড়েছিলেন। এই ব্যাপার সত্য মিথ্যা আমি জানতে চাই না। তবে তখন বেশ কজন ব্লগারের লেখায় পড়েছিলাম, তসলিমা নাসরিন তাঁর চারপাশে তাঁকে তোষামোদ করে এমন কাউকে রাখতে ভালবাসেন ! কেউ তাঁর বিরুদ্ধ কথা , তাঁর লেখার সমালোচনা করলে নিতে পারেন না। আপনি তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, এই অভিযোগ কতটা সত্য?

উনি যদি তোষামুদে লোকেদের নিজের আশেপাশে রাখতে ভালবাসতেন তাহলে তো ওনার একা থাকারই কথা না। কারণ দেশে বিদেশে ওনার ফ্যান ফলোয়ার অফুরান। আর বিরূদ্ধ মত যদি না সইতেন তবে তো এতদিন টিকে থাকতেও পারতেন না। কারণ কলম ধরার সময় থেকেই ওনার চেয়ে বেশি বিরূদ্ধ মত বোধহয় আর কোনো লেখককে সহ্য করতে হয় নি। আসলে কিছু মানুষ ইচ্ছেকরে এসব রটায়, আমোদ পায়। অন্যদের কথা জানি না, তবে উদাহরণ হিসেবে নিজের কথা বলি, আমি প্রথম দিদির সাথে কথা বলার সুযোগ পাই ২০০৯ সালে টুইটারে। সেখানে কিন্তু প্রসংশা সূচক কথায় রিপ্লাই পেতাম না, যুক্তিসহ কোনো ইস্যুর রিপ্লাই দিলে তবেই মিলত প্রত্যুত্তর। সুতরাং ওইসব উঠতি পণ্ডিত ব্লগাররা যারা তসলিমার মত যোদ্ধা ; যিনি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মৌলবাদ বিরোধি নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের লড়াই চালাচ্ছেন তার দিকে আংগুল তুলছে, তারা নিজেদের স্তুতি ছাড়া অন্যকিছু বরদাস্ত করতে পারে কিনা সেটাও ভাবার বিষয়।

এইতো সেদিন তসলিমা নাসরিন লেখায় বললেন, কই উনার যখন বই নিষিদ্ধ হয়েছিল, দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল ভারতের কোন লেখক তো নিজেদের সম্মান ফিরিয়ে দিয়ে, অসহযোগ আন্দোলনে ডাক দেয় নি! একই ব্যাপার বাংলাদেশেও। এপার বাংলা ওপার বাংলা কোন বাংলাতেই নিরাপদ না তসলিমা নাসরিন ! বাংলা কি এখনও তসলিমাকে নেওয়ার মত পরিণত না ?
হুম. আমারও তাই মনে হয়। অন্য লেখকদের ক্ষেত্রে ‘প্রতীকি প্রতিবাদ ‘ ব্যাপারটা যতটা ‘সেফ প্যাসেজ ‘ হিসেবে গ্রাহ্য হয়, তসলিমার ক্ষেত্রে বাংলা কিন্তু এখনো তত পরিনত আচরনের পরিচয় দিতে পারে নি।

ব্যাক্তিগত প্রশ্ন, কাছ থেকে দেখেছেন বলে বলা, কেমন আছেন দেশ ছেড়ে তিনি ? যেখানে ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন মৌলবাদের দল।
নিজেকে তিনি গ্লোবাল ভিলেজের সিটিজেন ভাবেন, বিশ্ববাসীর প্রতি হওয়া নানা অত্যাচারের উপর বলিষ্ঠ মসীর প্রলেপ লাগিয়ে, প্রতিপদে মৃত্যুর পরোয়ানাকে ইগনোর করে তিনি কেবল মজে আছেন নিজের লেখালিখির জগতে। তাঁর সাক্ষী তাঁর পালিতা কন্যা মিনু, আমরা দুচার জন বন্ধু স্থানীয় মানুষজন আর বুকের ভেতর নিশিদিন জেগে থাকা বাংলাদেশ। খুব কি খারাপ আছেন?

toslima 2
আপনার কি মনে হয়, আমাদের এই প্রজন্মের হাত ধরে তসলিমা নাসরিন দেশে ফিরে আসতে পারবেন ?

না। আজকের বাংলাদেশের পরিস্থিতি দেখে আমার ভুলেও তা মনে হয় না। আর এত বছর পর দেশের এত অবনতি দেখে ওনার ফেরার ইচ্ছে কতখানি আছে সেটাও মাঝে মাঝে ভাবায়।

Advertisements