দীর্ঘদিন জড়িত আছেন শিক্ষকতার সঙ্গে। পেয়েছেন ফেনী জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকার সম্মান। কবিতা, প্রবন্ধ , গল্প লেখেন স্থানীয় পত্রিকায়। নিজের লেখা কবিতার দুটো বইও বের হয়েছে। এতসবের মধ্যেও পালন করে যান পরিবারের সমস্ত কর্তব্য। দু সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে নদী পড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে , ছেলে তাসীন পড়ছে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে, একাদশ শ্রেণীতে । সেরা মা, সেরা শিক্ষক, হাসিমুখের মানুষ  ফেরদৌস আরা শাহীন আপু ফেমিনিজমবাংলার মুখোমুখি হয়ে বলেছেন, তাঁর কণ্টকময় জীবনের গল্প, সংগ্রামের গল্প, কষ্টার্জিত অর্জনের গল্প।

শাহীন আপু , ফেনী জেলার মধ্যে সেরা শিক্ষিকা, শিক্ষক জীবনের  দীর্ঘদিন চলার পথে অবদানের পুরষ্কার, একজন শিক্ষক হিসেবে সেই অনুভুতির কথা বলুন ?

পুরষ্কার মানেই কাজের স্বীকৃতি। আমি আজ সেটা পেয়েছি। আমি মনে করি সেটা আমার কাজের প্রতি আন্তরিকতা আরো বাড়িয়ে দেবে। আমার দায়িত্বও বেড়ে গেলো। এক ভীষন ভালোলাগা কাজ করছে আমার ভেতর।

আপনার পেছনের গল্প একটু শুনি, স্কুল, কলেজ , গ্র্যাজুয়েশন?

সোনাপুর প্রাইমারি এবং সোনাপুর হাই স্কুল থেকে এসএসসি, এইচ,এস, সি পড়ি ছাগলনাইয়া সরকারি কলেজে, বি,এ (পাস) ফেনী সরকারি কলেজে। এম,এ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পড়তে পড়তে কি বিয়ে ?

বি,এ পরীক্ষার মাত্র দেড় মাস আগে বিয়ে হলো।

তার মানে বিয়ের পরে পড়াশুনা, অতঃপর চাকরি ! সংসার করে এই সবকিছু সামাল দেওয়া সম্ভব হল ! পরিবারের সহযোগিতা কেমন পেয়েছেন?

তেমন পাইনি। দেখা গেছে ভার্সিটিতে এক্সাম।দেবার সময় মেয়েটাকে বারান্দায় বসিয়ে রেখে আমি ভেতরে। মাঝে মাঝে বেরিয়ে দেখতাম ও আছে কি না। কখনো কখনো আমার মা আমার বাচ্চাদের দেখে রেখেছিলেন। উনিও শিক্ষক ছিলেন। তাই সবসময় পেরে উঠেন নি।

shahin api 2তাহলে এতদূর আসাটা সত্যিই সংগ্রামের ছিল, সেটা কি মনের জোরের কারনেই সম্ভব হয়েছে ? কখনও কি মনে হয়েছে “চাকরি ছেড়ে দেই” ?

অবশ্যই সংগ্রাম। আর কখনোই মনে হয়নি চাকরি ছাড়ার কথা। তবে এই পেশাটাকে এত বেশি ভালোবেসেছি যে অন্য পেশায় যাবার কথা কখনো ভাবিনি।

অনেক মেয়েরাই তো পরিবার অসহযোগিতার কথা ভেবে চাকরি ছাড়ে। আপনি একজন শিক্ষিকা, সেই দৃষ্টিকোন থেকে আপনার কোন ছাত্রী যদি এমন করে, তার প্রতি কি পরামর্শ থাকবে আপনার ?

ওকে অবশ্যই চাকরিতে থাকার পরামর্শ দেব।মেয়েদের আর্থিক নিরাপত্তা আত্নবিশ্বাসী করে,যেমন আমাকে করেছে।

শিক্ষক হিসেবে আপনার যাত্রা অনেক দিনের। এখন একটা স্কুলের হেডমিস্ট্রেস আপনি। এই দীর্ঘজীবন পাড়ি দিতে আপনি পুরুষ সহকর্মীদের কাছে কি উপযুক্ত ব্যবহার পেয়েছেন ?

আমি পুরুষ সহকর্মী বলতে গেলে পাইনি। যাদের পেয়েছি তারা মোটামুটি ভালোই।

নিজ স্কুলের সামনে সহকর্মীর সঙ্গে

আজকের প্রজন্মকে একজন শিক্ষক হিসেবে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন ?

এই প্রজন্মের অনেকে মেধাবী। তবে তারা গুরুজনকে, বিশেষ করে শিক্ষকদেরকে কম সম্মান করে। পরীক্ষা পদ্ধতির জন্য নমনীয় পাশ,সহজবোধ্য এবং পাশযোগ্য প্রশ্নের জন্য ওদের অনেকে গাফিলতি করে। ভাবে পাশ তো করব ই।আবার কেউ কেউ ভাবে ভাল পাশ করে কি হবে,ভাল কোথাও তো চান্স পাব না। না উচ্চতর ডিগ্রীর ক্ষেত্রে না চাকুরির ক্ষেত্রে।তাছাড়া শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেয়া এখন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।প্রায় প্রকাশ্যেই শিক্ষকরা অপমানিত হচ্ছে। এসবও তাদেরকে ঐ রকম বানিয়ে ফেলছে।ওভারঅল,২০ বছর আগে ওরা যেমন সম্মান করে চলত,এখন তেমন নেই। সিরিয়াসনেসের প্রচন্ড অভাব।

শিক্ষকদের অনেক সময় বেতন নিয়ে ধর্মঘট করতে হয়, আন্দোলনে নামেন তাঁরা, নিজের জীবনে এইরকম কিছু মুখোমুখি হয়েছেন কি ? শিক্ষক পেশায় কম বেতন নিয়ে মন খারাপ হয় ?

আমি নিজেই বেতনের প্রশ্নে আন্দোলন করতে ঢাকায় গিয়েছিলাম।কম বেতনের জন্য মন খারাপ একটু আছে।নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস,যেমন পেঁয়াজের কেজি ৭৫ টাকা হলে শিক্ষক বলে দোকানী আমাকে ১০ টাকায় দেয় না।৭৫ টাকাতেই কিনতে হয়।সমযোগ্যতা সম্পন্ন একজন যদি আমার চেয়ে দ্বিগুন তিনগুন বা আরো বেশি বেতন পায় তার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়।আমি বলছি না যে তাঁরা শ্রম দিচ্ছেন না।তবে আরেকটু আর্থিক দিক আমাদের জন্য বিবেচনা করা উচিত।এই বেতনে পোষাচ্ছে না।করছি শুধু পেশাটাকে ভালোবেসে।স্কুলের বাচ্চাদের দিকে তাকালে সব ভুলে যাই।মজার ব্যাপার হচ্ছে শরীর খারাপ নিয়ে স্কুলে গেলেও একটু পর ভুলে যাই কত অসুস্থতা নিয়ে আজকের দিনটা শুরু হয়েছিল।

schoolএরকম কি হয়েছে, কোন ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গিয়েছে, ৯ ১০ এ থাকতে, থামাতে পারেননি। বা থামিয়েছেন ?

এরকম কিছু হয়নি।

নারী মুক্তি নিয়ে কিছু বলুন, যেহেতু কাছ থেকে শিক্ষার্থীদের আপনি দেখেছেন।

আমি যেটুকু বুঝি নারীমুক্তি নিয়ে তা হলো,মেয়েদের পড়তে হবে।কমপক্ষে এস এস সি।ঐ পর্যন্ত পড়াটুকু মন দিয়ে করতে হবে।পাশাপাশি দৈনিক পত্রিকা পড়তে হবে নিয়মিত।এইচ এস সি পর্যন্ত বিয়ে কিংবা প্রেমের রিলেশনে জড়ানো যাবে না।এটা বলছি একারণে যে এ বয়সে প্রেম বা বিয়ে যে কোন মেয়ের জন্য বিরাট বাধা।বেশিরভাগ মেয়েই এই বাধা ডিঙিয়ে উপরে উঠতে বা তার ন্যয্য অধিকার আদায় বা বুঝে উঠতে পারে না।নিজ অধিকার কি কি আছে, সেটাই বুঝতে পারে না।সংসারে সবার মন যোগাতেই দিন মাস বছর পেরিয়ে যায়।এই ফাঁকে পুরুষগুলো ওদের ঠকায়।যখন কোন মেয়ে এটা বুঝতে পারে সাধারনতঃ তখন আর করার কিছুই থাকে না।নারীকে বুঝতে হবে স্বাবলম্বী হতে পুরুষ ই দেবে না অথচ নিজে স্বাবলম্বী হলে দেশ ও হবে।তবে আরেকটা কথা ধর্মীয় দিকটাও দেখতে হবে।মেয়েদেরকে মিডিয়া কিংবা সিনিয়রদের কাছ থেকে সফল নারীর গল্প শুনতে হবে।সম্ভব হলে প্রযুক্তির ব্যবহার জানতে হবে।

Advertisements